রুহিতপুরের লুঙ্গির এত নাম কেন? এর বিশেষত্বটা কী?
তাঁতশিল্পী মো. নাঈম সহজভাবে বললেন, ‘পরতে আরাম ও টেকসই। তাই এটা সেরা।’
আরেকটু যোগ করলেন রুহিতপুরের বাসিন্দা নাসিম হোসেন, ‘এখানে লুঙ্গিটা তৈরি হয় ৮০ কাউন্টের সুতায়। এর নিচে হলে তাঁতিরা কাজ করেন না। তাই এখানকার লুঙ্গির বৈশিষ্ট্যই আলাদা। শৌখিন আর অভিজাত মানুষ খোঁজ করেন রুহিতপুরের লুঙ্গির।’
আরামদায়ক হওয়ায় ঘরোয়া পোশাক হিসেবে অনেকেরই পছন্দ লুঙ্গি। গ্রাম তো বটেই, শহুরে পুরুষদেরও পছন্দের পোশাক হিসেবে কদর আছে লুঙ্গির। ঢাকা বা দেশের অনেক বাজারেই রুহিতপুরের আসল লুঙ্গির নামডাক ভালোই আছে। তাই যাওয়া রুহিতপুরে।
পুরান ঢাকার নয়াবাজার-বাবুবাজার পেরিয়ে দ্বিতীয় বুড়িগঙ্গা সেতুর ওপারেই কেরানীগঞ্জ। এই কেরানীগঞ্জ উপজেলার একটি ইউনিয়ন রুহিতপুর। সেতু পার হলে মোটরযানে আধা ঘণ্টা বা ৪০ মিনিটের পথ। প্রথমেই যাওয়া হলো রুহিতপুরের উত্তর রামেরকান্দা গ্রামের এক তাঁতিবাড়িতে। তখন বিকেল। উঠোনে পরিবারের এক নারী সদস্য চরকায় সুতা জড়াচ্ছেন। মাটির মেঝের উঁচু ঘরের দাওয়ায় লুঙ্গির সুতা টানা দেওয়া। পাশেই হাততাঁতে সাদা লুঙ্গি বুনছেন তাঁতি মো. নাঈম। তিনি জানালেন লুঙ্গি তৈরির প্রক্রিয়াগুলো।
সুতা সংগ্রহ করে কখনো সরাসরি চরকায় পেঁচিয়ে তা গোছানো হয়, আবার কখনো চরকায় তোলার আগে তাতে রং করা হয়। এরপর লুঙ্গির নকশা ঠিক করে টানা দেওয়া হয়। টানার পর সেটা তোলা হয় তাঁতে। একসঙ্গে তাঁতে বোনা হয় এক থান মানে চারটা লুঙ্গি। বুনন শেষ হলে ধোলাই ও মাড় দেওয়া হয়। তারপর ভাঁজ করে যন্ত্র দিয়ে চাপ দেওয়া হয় লুঙ্গিতে। এ যন্ত্রের স্থানীয় নাম প্রেস। এরপর লুঙ্গি চলে যায় বাজারে।
রুহিতপুরের লুঙ্গির নামডাক যা-ই থাকুক, উৎপাদন আগের মতো নেই। মো. নাঈম জানালেন তাঁতশিল্পের সেই পুরোনো সমস্যার কথাই—সুতার দাম বেশি। কাজ অনুযায়ী লাভ কম। ঘরের দরজা থেকে এক নারী সদস্য যোগ করলেন, ‘আগে এক মুড়া সুতার দাম ছিল ১৮টাকা। এখন ৪০ থেকে ৪২ টাকা।’
পাশের বাড়ির লুঙ্গি ব্যবসায়ী কবির হোসেন জানালেন, চার-পাঁচ বছর আগেও রুহিতপুর ইউনিয়নে মোট তাঁতের সংখ্যা ছিল ২০০। এখন কমে কমে এ সংখ্যা ১৮ থেকে ২০। মানে মাত্র ২০টি তাঁতি পরিবার এখন লুঙ্গি তৈরি করেন। প্রতি সপ্তাহে এখানে তৈরি হয় দুই শতাধিক লুঙ্গি।
রুহিতপুরের লুঙ্গির চাহিদা কিন্তু এখনো আছে আগের মতো। তবে সরবরাহ সে তুলনায় অনেক কম। কারণ হিসেবে নাসিম হোসেন জানালেন, তাঁতিদের লাভের হার কমে গেছে। লুঙ্গি তৈরিতে তাঁতির পরিবারের শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই জড়িত থাকে। লুঙ্গির একটা থান তৈরিতে ন্যূনতম দুই থেকে আড়াই দিন সময় লাগে। বিক্রি করার পর লাভের অঙ্কটাও বেশি না।
তাঁতি ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে জানা গেল, রুহিতপুরে এখন সিরাজগঞ্জ থেকেও লুঙ্গি আসে। সেসব তৈরি লুঙ্গিতে এখানে মাড় দেওয়া ও মোড়কজাত করা হয়। সেগুলোর মান রুহিতপুরের আসল লুঙ্গির মতো নয়। এই দুইয়ের মাঝখানে দোহার উপজেলার জয়পাড়ায় তৈরি তাঁতের লুঙ্গির চাহিদাও বাড়ছে বাজারে। নাসিম হোসেনের মতো মানের দিক থেকে রুহিতপুর আর সিরাজগঞ্জের লুঙ্গির মাঝামাঝি অবস্থানে আছে জয়পাড়ার লুঙ্গি।
রুহিতপুরের লুঙ্গি বেশ বড়সড়। ৪ হাত x ৫ হাত মাপের এসব লুঙ্গির দাম প্রতিটি ৫০০ থেকে ৭৫০ টাকা। আসল রুহিতপুরের লুঙ্গি চিনবেন কীভাবে? স্থানীয়দের কথা—হাতে নিলেই বুঝবেন। কিন্তু বাইরের বা অনভিজ্ঞ লোকজন তো হাতে নিয়েও বুঝতে পারবেন না। তাদের তাকাতে হবে পাড়ের দিকে। পাড়ে ছিদ্র থাকবে। এই ছিদ্র তাঁতে লাগানোর সময় হয়ে থাকে। আর হাতে নিলেও বোঝা যায় এর কাপড়ের মসৃণতা। যে মসৃণভাবই নিয়ে আসে পরার আরাম। তাই তো রুহিতপুরের লুঙ্গির এত খ্যাতি।

পল্লব মোহাইমেন
সহযোগিতা: ইকবাল হোসেন কেরানীগঞ্জ (ঢাকা) প্রতিনিধি
সূত্র: দৈনিক প্রথম আলো, এপ্রিল ০৫, ২০১১